
কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি : ষাটের দশকে তৎকালীন ঢাকা জেলার কালীগঞ্জ থানা এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে শিক্ষা লাভের সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। বহু দূরদূরান্তে ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেই সময় স্থানীয় শিক্ষার্থীরা দূরের কোন এলাকায় লজিং থেকে কিংবা নিয়মিত যাতায়াত করে পড়াশুনা করতেন। ১৯৬৭ সনে কালীগঞ্জ থানার চুপাইর উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত ফুলদী, বেরুয়া, ভাটিরা, মাজুখান ও কলুন গ্রামের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের এক মনোমালিন্য হয়। যা পরবর্তীতে সংঘাত সংঘর্ষে রূপ নেয়। কালীগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার বাতিঘর জনতা উচ্চ বিদ্যালয় ফুলদী।
মুলত সেই সংঘাত থেকেই অত্র এলাকায় একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হন এলাকার নেতৃস্থানীয় ও আপামর জনসাধারণ। তাদের সাথে যোগ দেয় ব্রাহ্মণগাও, নাওয়ান, বক্তারপুর ও কৌচান এলাকার জনগণ। কিন্তু কোথায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কে বিদ্যালয়ে জমি দিবে, তা নিয়ে শুরু হয় চুলচেরা বিশ্লেষণ! বাস্তবিক বিদ্যালয়ের জমি দেয়ার মত জমি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে জমিদার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ খান আব্দু মিয়া ও মুসলেহ উদ্দিন আহমেদের প্রতিষ্ঠিত ফুলদী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের বিশাল চালা জমিটিতে নতুন উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনের সর্ব সম্মত সিদ্ধান্ত জানায় এলাকাবাসী।
কিন্তু বিদ্যালয়ের ওই চালা জমিটি তিন বিঘা থাকায় আরো তিন বিঘা জমির প্রয়োজন হয়। সেই অনুযায়ী বিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা, প্রতিষ্ঠাতা ও ভূমিদাতা জমিদার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ খানের (আব্দু মিয়া) জেষ্ঠপুত্র বিশিষ্ট সমাজসেবক ও তৎকালীন ইউনিয়ন বোর্ডের সদস্য ডাঃ মুক্তাজুল হোসেন খান (রাজা মিয়া), তার ছোট ভাই-বোন আতাহার উদ্দিন খান (মানিক মিয়া), আজহারউদ্দিন খান (শাহজাদা মিয়া), নুর আক্তার বেগম এবং তাদের চাচাতো ভাই মাহবুবুর রহমান খান (মহুব মিয়া) সিদ্ধান্ত নেন, ফুলদী ঈদগাহ ময়দানের পাশে থাকা (বর্তমান আমটেকির পুকুর) তাদের অপর ৩ বিঘা জমিও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় দান করবেন। সে হিসেবে তারা ৬ বিঘা জমি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় দান করেন। এর বাইরে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অন্য কোন পরিবারের এক তিল জমিও এখানে নেই। এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় এলাকাবাসী যার যার সামর্থ্যানুযায়ী টিন, কাঠ, বালু, টাকা-পয়সা, স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন। সবার প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে জনতা উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে বিদ্যালয় পরিচালনায় সভাপতি শিল্পপতি মজিব উদ্দিন খান, সম্পাদক মো. সাইদুর রহমান দোলন ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে এডভোকেট সোয়েব খানকে নির্বাচিত করা হয়। ওই কমিটিতে উদ্যোক্তা, প্রতিষ্ঠাতা ও ভূমিদাতা হিসেবে ডাঃ মুক্তাজুল হোসেন খান (রাজা মিয়া), আতাহার উদ্দিন খান (মানিক মিয়া), আজহারউদ্দিন খান (শাহজাদা মিয়া), নুর আক্তার বেগম এবং মাহবুবুর রহমান খানের (মহুব মিয়া) নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়া ঐ কমিটিতে এলাকার নেতৃস্থানীয় বেশ কয়েকজনের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
উল্লেখ্য, সেই সময় ফুলদী কৃষক সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান মহসিন খান জবরদখলকৃত (ফুলদী বাজারের পূর্ব পার্শের বর্তমান বাড়ি) জমি হতে তিন শতাংশ জমি সমিতির নামে প্রদান করেন, জমিনের দখলীয় বৈধতা আনার চেষ্টায়। যাহা পরবর্তী সময় বিদ্যালয়ের সাইন্সল্যাব হিসেবে বহুদিন ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বর্তমানে ওই জমি (পোষ্ট অফিস ঘর বাদে) মহাসিন খানের সন্তানদের ভোগ দখলে আছে।
এই এলাকার জনহিতৈষী ব্যক্তিদের আত্মত্যাগ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনকল্যাণমূলক মানসিকতায়ই ১৯৬৮ সনে শিক্ষার বাতিঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত জনতা উচ্চ বিদ্যালয় ফুলদী আজো এলাকায় সুশিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুধু শিক্ষা নয়, বরং একটি শিক্ষিত, সচেতন ও উন্নত সমাজ বিনির্মাণের ভিত্তি রচিত হয়। দীর্ঘ কয়েক দশকের পথচলায় জনতা উচ্চ বিদ্যালয় ফুলদী আজ কালীগঞ্জের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি হাজারো শিক্ষার্থীর জ্ঞানচর্চা, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ গঠনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় এমপি’র ছত্রছায়ায় এই বিদ্যালয়ে কায়েম হয় স্বৈরতন্ত্র। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি তার নিজস্ব বাহিনী নিয়ে খেয়াল খুশি মতো কমিটি গঠন, রেজুলেশন তৈয়ার, এবং নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন বলে একাধিক অভিযোগ এলাকার জনগণের মুখে মুখে। এসব নিয়োগ এবং অনিয়মের তদন্ত করার জন্য এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এলাকাবাসী মনে করেন, যত দ্রুত সম্ভব এই বিদ্যালয়ে বিগত সময়ে সংগঠিত সকল অনিয়ম, দূর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত পূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার মান ও ঐতিহ্য ক্রমেই ম্লান হয়ে যাবে।






































